আতোয়ার রহমান মনির, বছরজুড়ে মাছ ধরলেও মৌসুম হিসেবে দুটি সময় ধার্য করেন জেলেরা। সেই মৌসুমের একটি জ্যৈষ্ঠ থেকে শুরু হলেও লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে এখনও প্রত্যাশিত ইলিশ পাচ্ছেন না তারা। পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় বর্তমানে পরিবার নিয়ে জেলেদের প্রাণধারণ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে এ স্বপ্ন নিয়েই এখন মেঘনায় ঘুরছেন জেলেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভর মৌসুমেও মেঘনায় ইলিশের আকাল চলছে।। প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ না পাওয়ায় জেলেরা হতাশ। প্রতি বছর জোয়ারের পানিতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়লেও এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই সেই চিত্রের দেখা মিলছে না।লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের চর বংশী গ্রামের জেলে নুর ইসলাম মোল্লা (৩৯)। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিনি নদীতে সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু ইলিশের ডালার অর্ধেকও তিনি ভর্তি করতে পারেননি। তাই ঘাটে ভিড়ানো নৌকায় গালে হাত দিয়ে বসেছিলেন নুর ইসলাম। কী ভাবছেন জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'কি আর ভাববো ভাই। নদীতে ফসল (মাছ) নাই। সারাদিনেও আধা ডালা মাছ মিলে না। কী করুম ভাবতাছি।'
তার কথা শেষ হতে না হতেই সত্তরোর্ধ্ব জেলে আলমগীর মাঝি সিলভারের থালায় কিছু মাছ নিয়ে এলেন। সেগুলো দেখিয়ে তিনি বলেন, 'সারাদিন জাল টেনে এক থালা মাছও পাওয়া যায় না। আগে এমন দিনে নদীর পাড় দিয়ে পুঁটি মাছ গড়াইয়া যাইত। সার কীটনাশকে মাছ শেষ কইরা ফালাইছে। এখন নদীতে খালি পানি, মাছ নাই।'
মাছ না পাওয়ার এমন আক্ষেপ শোনা গেল জেলে রফিজল, মোকলেছ, সুফিয়ান, হাসেম, আনোয়ার, হাছন আলী, দুদু মিয়া ও ছায়দুলের কণ্ঠেও। ভর মৌসুমেও মেঘনায় পর্যাপ্ত ইলিশ না পেয়ে চিন্তিত লক্ষ্মীপুরের মেঘনাপাড়ের জেলে পল্লীর মানুষরা। পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে দিনযাপন করবেন সেই চিন্তায় তারা এখন অস্থির। যাদের হাতে অল্প কিছু পুঁজি আছে পুকুরে মাছ চাষের পর তা বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
সূত্র জানায়, বেশকিছু কারণে মেঘনায় ইলিশের আকাল পড়েছে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে নদীর নাব্যতা হ্রাস, নদী দূষণ, ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চলাচলসহ বিভিন্ন কারণে মাছের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস। এসব ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে জেলেদের।জানা যায়, এক সময় মেঘনা নদীর মাছের ঐতিহ্য ছিল পুরো দেশব্যাপী। নদীতে সারাবছরই বোয়াল, চিতল, রুই, কাতলা, আইড়, ছোট-বড় খুলি, লাচু, মলা-ঢেলা, পুঁটি-সরপুঁটি, কাইক্যা, চিতল, গইন্যা, শোল, গজার, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়ি, বাইম, কৈ, শিং, মাগুর প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। উপকূলীয় এলাকার কয়েক হাজার জেলে মেঘনার মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জেলেরা সারা বছর নদীতে মাছ ধরলেও তারা মাছ পাওয়ার মৌসুমকে দুটি ভাগে ভাগ করে নিয়েছেন। এর মধ্যে একটি বর্ষার শুরু থেকে মাঝামাঝি এবং অন্যটি শুকনো মৌসুম অর্থাৎ নদীর পানি কমে যাওয়ার শুরু থেকে ফাল্গুন-চৈত্র পর্যন্ত। দু'মৌসুমে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। বর্ষাকালে ছোট-বড় খুলি, লাচু, মলা-ঢেলা, বাইলা, পুঁটি-সরপুঁটি, কাইক্যা, চিতল, গইন্যাসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর চিংড়ি মাছ পাওয়া যায়। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে পাওয়া যায় বোয়াল, রুই, কাতলা, কৈ, শিং, মাগুর, শোল, গজার, টাকি, টেংরা ও মেনি মাছ। এ মাছের ওপর নির্ভর করেই লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় গড়ে উঠেছে ১০-১২টি মাছের আড়ত। আবার এসব আড়তের কারণে মাছ সংরক্ষণের জন্য স্থাপিত হয়েছে ৪০টি আইস ফ্যাক্টরি। এতে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে।রায়পুরসহ লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন উপজেলার ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর মাছ ব্যবসায় লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে মেঘনায় পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। মাছ সংকট চলতি বছর আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। বলতে গেলে জেলেরা প্রায় খালি হাতেই ফিরছেন নদী থেকে। এতে ভীষণ কষ্টে পড়েছেন দরিদ্র জেলে পরিবারগুলো। পরিবার নিয়ে দু'বেলা দু'মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করাও বর্তমানে তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা এ ভেবে অস্থির_ সামনেও যদি পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া না যায় তাহলে তারা কি করবেন। তাদের কাছে পর্যাপ্ত পুঁজিও নেই যে অন্য কোনো ব্যবসা করবেন। তাছাড়া মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজও জানা নেই তাদের!
বাপ দাদার আমল থেকেই মাছ শিকারই মেঘনাপাড়ের বাসিন্দাদের একমাত্র পেশা। মাছ শিকার
