রায়পুরে সেচ পানির মূল্যবৃদ্ধিতে বোরো চাষীরা হতাশ!

আতোয়ার রহমান মনির; রায়পুর, লক্ষ্মীপুর : চলছে ইরি-বোরো চাষাবাদের ভরা মৌসুম। সারে, ভেজাল, কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিং, কৃষি শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস ইত্যাদি সমস্যার সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে সেচ পানির মূল্যবৃদ্ধি। পানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এলাকার কৃষকেরা। ইরি-বোরো চাষের অন্যতম প্রধান উপকরণ পানি। কিন্তু সেই পানিও আর পানির দরে নেই। গতবারের তুলনায় দাম বেড়েছে ২-৩ গুণ।
রায়পুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায় , উপজেলার ১০ টি ইউনিয়নে এবার ৬ হাজার ৪ শত হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি বিভাগের মতে, এ বছর লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে বেশি জমিতে ইরি-বোরো রোপন করা হবে। বাজারে সার কীটনাশকে ভেজাল ও মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের লোডশেডিং, কৃষি কাজে শ্রমিকের (বদলা) মজুরী বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যায় প্রায় হাঁপিয়ে ওঠে এ জেলার কৃষকেরা। নানামুূখী সমস্যা মোকাবেলা করেও তারা ইরি বোরো রোপন করেছেন। সব কিছুর পর নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে ক্ষেতে সেচ পানির মূল্য নিয়ে। ঋতুচক্রে এখন চৈত্র মাস। আকাশে বৃষ্টির কোন আভাস নেয়নি। নদী-নালা, খাল-বিল পানিশূণ্য। ইতোমধ্যে সবল হয়ে উঠছে ইরি বোরো চারা। ক্ষেতকে বাঁচাতে কৃষকরা এখন ছুটছেন গভীর-অগভীর পাম্প ও শ্যালোমেশিন মালিকদের কাছে। আর এতে একশ্রেণির পাম্প ও শ্যালোমেশিন মালিক বিদ্যুৎ এবং তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ২-৩ গুণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে কৃষকদের কাছ থেকে। তারপারও ভোগান্তির শেষ নেই এ উপজেলার কৃষকদের। লোডশেডিং আর সিরিয়ালের ফাঁদে পড়ে অনেককে রাত পার করতে হচ্ছে ক্ষেতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গত বছর প্রতি ঘন্টা সেচের মূল্য ছিল ৪০ থেকে ৬০ টাকা। এখন তা ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। আবার কোন কোন এলাকায় ঘন্টার পরিবর্তে মৌসুম চুক্তি প্রথা চলছে। এক্ষেত্রে বিঘাকে (৩০ শতক) একক হিসেবে ধরা হয়। গত মৌসুমে এলাকাভেদে প্রতি বিঘা জমির সেচ চুক্তি ছিল ৭�শ টাকা থেকে সাড়ে ৮�শ টাকা। এখন তা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২�শ টাকা। তবে পানির মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে পাম্প ও শ্যালোমেশিন মালিকরা দায়ী করছেন জ্বালানী তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকে।
চরবংশী এলাকার কৃষক হানিফ দেওয়ান বলেন, এখন খরা মৌসুম। এ মৌসুমে সার কীটনাশকের তুলনায় ক্ষেতে পানির প্রয়োজন বেশি। তিনি তার ক্ষেতে এ পর্যন্ত ৮ বার সেচ দিয়েছেন। গতবার ঘন্টা প্রতি ৪০ হতে ৫০ টাকা দরে পানি কিনে ছিলেন কিন্তু এবার হচ্ছে ১৪০ টাকা দরে। তাছাড়া পানি পেতে সিরিয়ালের ভোগান্তির কথাও জানান তিনি।
একই অবস্থা উপজেলার আরো ৯ টি ইউনিয়নেও। চরবংশী ইউনিয়নের কৃষক হেদু মিয়া পানির মূল্যবৃদ্ধির কথা স্বীকার করেন। গত বছর ৮�শ টাকার মৌসুম চুক্তি দিলেও এবার দিতে হবে ১ হাজার ১�শ টাকা। লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ দিতে বিড়ম্বনার শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।
কৃষক সফি উল্লাহর মতে, পানির মূল্য নির্ধারণে সরকারের হস্তক্ষেপ থাকা দরকার ।
এদিকে কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করেন পাম্প এবং শ্যালোমেশিনের একাধিক মালিক। তারা বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিং ও জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। তবে পানি পেতে সিরিয়াল ভোগান্তির বিষয়টি অতিরিক্ত চাহিদার কারণে হচ্ছে বলে জানান। এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র সরকার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কৃষকদের কাছে ইরি বোরো ক্ষেতে সেচের পানির অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার বিষয়টি শুনেছি। কিন্তু সেচের পানি বন্টন নিয়ে সরকারী কোন নীতীমালা না থাকায় অভিযুক্তদের বিরুদ্বে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে কৃষকেরা সচেতন হলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কৃষিবিদ ঈসা জাকারিয়া ও অভিজ্ঞ মহলের মতামত � সারে, ভেজাল, কীটনাশকের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের ঘনঘন লোডশেডিং, কৃষি শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস ইত্যাদি সমস্যার থেকে রোধ করতে হবে�। তাহলে চলতি বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে রায়পুর উপজেলায় এবার বোরো উৎপাদনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।