ইলিশ আহরণে নামছেন জেলেরা


undefined
আতোয়ার রহমান মনির-: ১১ দিন পর আজ সোমবার জেলেরা ইলিশ আহরণে নামছেন। এতে জেলেদের চোখে-মুখে হাসি ফুটলেও মনে শান্তি নেই। কারণ,প্রজনন মৌসুমের আওতায় ১১ দিন পদ্মা-মেঘনা বক্ষে ইলিশ ধরা বন্ধ থাকায় মেঘনা নদীতীরবর্তী ২০ হাজার জেলে পরিবারের দিন কেটেছে অনাহারে-অর্ধাহারে। ঘাড়ে চেপেছে ঋণের বোঝা। নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করার আগে এ বিপুলসংখ্যক জেলের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তারা। বন্ধ থাকায় জেলেরা জানায়, হঠাৎ করেই চলতি মাসের ৬ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের অন্য ইলিশ বিচরণ ক্ষেত্রগুলোর মেঘনায় লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলার একশ কিলোমিটার নদী এলাকায়ও ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ গত বছর এ সময়টা ছিল আরও কম এবং ইলিশ ছাড়া অন্যান্য মাছ আহরণ করার অনুমতি ছিল লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর অঞ্চলে। আইনটি গত মৌসুমে প্রয়োগ করা হয়েছিল শুধুই উপকূলীয় ইলিশ প্রজনন ক্ষেত্রগুলোতে। বিচরণ ক্ষেত্র ছিল বাদ। হঠাৎ করে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা আসায় লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলার সদর, হাইমচর, মতলব উত্তর ও মতলব দক্ষিণের ২৪ হাজার জেলের জন্য ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো।
জীবিকার তাগিদে কিছু কিছু জেলে সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে রাতের আঁধারে চুরি করে মাছ শিকার করেছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার পল্লীতে ইলিশ বিক্রির সময় বুধবার সকালে দুই খুচরা বিক্রেতাকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রায় ২০ কেজি ইলিশ পাওয়া যায়। আটকরা হলেন- উপজেলার উদমারা গ্রামের আহসান উল্যার ছেলে জসিম (২৪) ও মৃত মকবুল আহাম্মেদের ছেলে দুলাল সর্দার (৩০)।হায়দরগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবদুল খালেক জানান, তাদেরকে আটকের পর দুপুর ১টার দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়।রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুলাল চন্দ্র সূত্রধরের আদালতে তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে। এ সময় আদালত প্রত্যেকের ১ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে সাতদিন করে কারাদ- দেন।এদিকে উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাতে মেঘনা নদীতে অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার মিটার ইলিশ ধরার জাল আটক করা হয়। জালগুলোর বাজারমূল্য ১০ লক্ষাধিক টাকা। পরে মেঘনার পাড়ে সেগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ সময় কোন জেলেকে আটক করা সম্ভব হয়নি । এছারা ১১অক্টোবর সকালে রায়পুরে মেঘনা নদীর পাড় থেকে ইলিশ কিনে রায়পুর শহরে আসার পথে ৬ ক্রেতাকে আটক করেছে হায়দরগঞ্জ ফাঁড়ির পুলিশ। পরে তাদের রায়পুরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়।
আটককৃতরা হলেন- পৌরসভার মধুপুর গ্রামের শামছুল আলমের ছেলে মোঃ ইয়াছিন, পূর্বলাছ গ্রামের আবুল কালামের ছেলে মোঃ আলমগীর, দেনায়েতপুর গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মোঃ ইব্রাহীম,চরআবাবিল গ্রামের আবদুল খালেকের ছেলে মোঃ জাকির, দেবীপুর গ্রামের আহছান উল্যার ছেলে মোঃ মামুন ও একই গ্রামের আমিন উল্যার ছেলে মোঃ সালেহ আহাম্মদ।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দুলাল চন্দ্র সূত্রধরের আদালতে মঙ্গলবার দুপুরে ওই ৬ ব্যক্তি তাদের দোষ স্বীকার করেন। পরে আদালত তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫শ টাকা করে জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেন। হায়দরগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আবদুল খালেক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।। জেল জরিমানা হয়েছে অনেক জেলের। আটক জালগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। মাছ দেওয়া হয়েছে এতিমখানায় এবং কিছু মাছ রাখা হয়েছে হিমাগারে। জেলেরা ধরা পড়ার পর নানা আকুতি জানিয়েছে প্রশাসনের কাছে। তারা প্রশাসনকে জানিয়েছে, ঋণের জালে বন্দি তারা। উপায়ন্ত না পেয়ে দিশেহারা হয়ে নদীতে নেমেছে। গত ক'দিন মাছ ধরতে না পারায় তাদের একমাত্র জীবিকা নির্বাহের পথ বন্ধ ছিল। একেকটি পরিবার ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ছোট বড় এনজিওর কাছ থেকে এবং মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালিয়েছে। অথচ কোনোরকম পুনর্বাসনের ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। এই জেলেরাই চলতি বছরে মার্চ-এপ্রিলের জাটকা নিধন রোধ আইনে পড়ে ২ মাস নদীতে যেতে পারেনি। ওই সময়ও তারা যথেষ্ট ঋণ করে বসে আছে। বেঁচে থাকার তাগিদে সংসার চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে পরিবারের কর্তাব্যক্তিরা। এভাবে একদিকে রোজগার বন্ধ থাকা অপরদিকে মহাজনের সুদ বেড়ে যাওয়ায় জেলে পরিবারের মধ্যে নেমে এসেছে চরম হতাশা।জেলেরা আরও জানায়, আমরা সরকারি সিদ্ধান্তকে অব্যশই শ্রদ্ধা করি; কিন্তু সরকারও আমাদের এহেন দুরবস্থার কথা বিবেচনা করে যদি আমাদের এ সময় একটু আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা দিত, তাহলে আমাদের অভাব একটু হলেও দূর হতো।এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বেলাল হোসেন জানান, ব্যাপকভাবে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে জেলেদের স্বার্থ বিবেচনা করেই। চাঁদপুর যেহেতু ইলিশ বিচরণ ও প্রজননের বৃহৎক্ষেত্র তাই এই পদ্মা-মেঘনা অংশও এ আইনের আওতায় পড়েছে।তবে তিনিও জেলেদের জন্য এ ১১ দিনের নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচিতে পুনর্বাসন ব্যবস্থার পক্ষে জোরাল মতামত ব্যক্ত করেছেন।